মাহবুব হাসান (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং মুজিবুর রহমানের ছেলে) | রবিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 605 বার পঠিত
মরহুম মুজিবুর রহমানের বিরামহীন সাধনা ও তপস্যার সাথে বাংলার জনগণ কতটুকু পরিচিত তা আমাদের জানা নেই। তবে ভাগ্যাহত বাঙালীর অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার জন্য তিনি যে একনিষ্ঠ প্রয়াস অব্যাহত রেখেছিলেন তা আগামীকালের ইতিহাস রচনাকারীগণ অত্যন্ত গর্বের সাথে উল্লেখ করবেন। সাবেক পাকিস্তানের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাত থেকে বীমা শিল্পকে মুক্ত করে বাঙালীদের মধ্যে শিল্পের সুফল বন্টন করার নির্ভিক ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অবশ্যই একটি বিল্পব। মরহুম মুজিবুর রহমান সে বিপ্লবের নায়ক। সে অভিযানে অগ্রদূত। তিনি প্রথম বাঙালী বীমা কোম্পানি হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। (সাধারণ বীমা কর্পোরেশন নিউজলেটার, মার্চ ১৯৭৫)।
মুজিবুর রহমান ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বীমা শিল্পের সবচেয়ে বিশিষ্ট ও সফল পথিকৃৎ। তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকায় প্রথম বাঙালী বীমা কোম্পানি, হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনে (বিআইসি তে যোগদানের আগ পর্যন্ত তিনি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার লক্ষ্য ছিল পরাধীনতা ও শোষণ থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে মুক্ত করা। স্বাধীনতার পর বীমা শিল্পকে একটি যৌক্তিক ও সুসংহত ভিত্তির উপর সংগঠিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন।
মুজিবুর রহমান ১৯১৮ সালের ১ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলা (বর্তমানে বাংলাদেশ)-এর পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জের রসুলপুর গ্রামে ইয়াকুব আলী সরকার ও ওয়াহিদুন্নেসার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন কঠোর পরিশ্রমী কৃষক। দুর্ভাগ্যবশত তিনি খুব অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান। তিনি অত্যন্ত বেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং সবসময় সরকারি বৃত্তি লাভ করতেন। কলকাতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সিরাজগঞ্জ গভর্নমেন্ট বিএল হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় (সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট) তিনি গণিত ও ইতিহাসে লেটার নম্বরসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ইতিহাসে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তাকে স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। রাজশাহী সরকারী কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রিপন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং অর্থনীতি ও ইতিহাসে বিএ ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান লাভ করেন।
১৯৪০ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ খান সাহেব বসির উদ্দিন সরকারের জ্যেষ্ঠ কন্যা রাবেয়া বেগমকে বিয়ে করেন। বিবাহিত জীবনে তাহেরা, শরীফা, মাহবুব, হাবিব ও শিরীন নামে তাদের পাঁচ সন্তান ছিল।
সিভিল সার্ভিস ও বীমা জীবন
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ ভারতে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) এ যোগদান করেন। প্রাথমিকভাবে তিনি পূর্ব বাংলার বগুড়ায় (যা পরে পূর্ব পাকিস্তান হয়) এবং ১৯৪৮ সালের শেষের দিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হন। বিসিএস এ যোগদানের পর ১৯৪৩ সালের বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। ব্রিটিশ সরকারের ব্যর্থ নীতির কারণে তিন মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে বাংলায় দুর্ভিক্ষ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। যুদ্ধকালীন মুদ্রাস্ফীতি, ফটকাবাজারি ক্রয় এবং আতঙ্কিত মজুতের সম্মিলিত প্রভাবে দরিদ্র বাঙালিদের জন্য খাদ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যায়। ওই সময় একজন জুনিয়র সিভিল সার্ভেন্ট হিসাবে জীবনধারণ ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি উপলব্ধি করেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশকে শোষণ করার জন্য প্রধান বাহনগুলোর মধ্যে সিভিল সার্ভিস ছিল একটি। সম্ভবত এই উপলব্ধি থেকেই কয়েক বছর পর বিসিএস ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন স্বাধীন পাকিস্তান (পূর্ব)-এর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, কৃষি এবং উদ্যোক্তা তৈরির উপর অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ।
পাকিস্তান (পূর্ব) সৃষ্টির কিছুদিন পরেই তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৪৯ সালের প্রথম দিকে একটি পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক বীমা কোম্পানি মুসলিম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের রাজশাহী শাখা অফিসের ব্যবস্থাপক হিসাবে যোগদান করে বীমা খাতে তার কর্মজীবন শুরু করেন । বীমা খাতে প্রবেশের আগে লন্ডনের চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট (সিআইআই) এর করেসপন্ডেন্স স্টাডি কোর্স সম্পন্ন করেন। কোম্পানিতে যোগদানের খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ঢাকা সদর দপ্তর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এর সামগ্রিক পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান । তিনি প্রায় দশ বছর এই কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন।
হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠা
বাঙালি মালিকানাধীন একটি বীমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল তার। ১৯৫৮ সালের আগে পূর্ব পাকিস্তানের বীমা শিল্প সম্পূর্ণরূপে পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক এবং কিছু বিদেশি বীমা কোম্পানি ও সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হতো। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দেশের পূর্বাঞ্চলে ঊনচল্লিশটি পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছিল। পূর্ব পাকিস্তানের পলিসিহোল্ডারদের প্রতিশ্রুতি এবং দায়বদ্ধতায় রেখে এসব কোম্পানির সম্পদ (প্রিমিয়াম আয়) পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিয়োগ করা হচ্ছিল, যা তাকে ভীষণভাবে হতাশ করে।
পঞ্চাশ বছর পরের গবেষণায় দেখা যায়, মোট বীমা আয়ের পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসলেও পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগ করা হয়েছিল পাঁচ শতাংশেরও কম। পাকিস্তানি ঐতিহাসিকরাও পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ স্বীকার করেছেন। তার আকাক্সক্ষা ও সংকল্প ছিল বীমা শিল্প বিকাশের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চিত ও শোষিত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন উন্নয়ন করা।
১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকায় হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এ সময় তাকে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিকতা ছড়িয়ে দিতে এ যুক্তিতে প্রাথমিকভাবে পাকিস্তান সরকার কোম্পানিটির অনুমোদন দিতে বিলম্ব করে। উপরন্তু, তাকে মূলধন সংগ্রহ এবং বীমা কর্মী নিয়োগের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল। তবে বাঙালি জাতিসত্তার প্রতি দৃঢ় সংকল্প ও ভালবাসার কারণে তিনি সব চ্যালেঞ্জর অতিক্রম করে সফল হয়েছিলেন। কিছু দেশপ্রেমিক ও নিবেদিত সহযোগীদের সাহায্যে একচেটিয়াভাবে আর্থিক সংস্থান অর্জন করতে সক্ষম হন। তাদের মধ্যে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার সাজেদুর রহমান খান, মকবুলার রহমান, লুৎফর রহমান এছাড়াও মঞ্জুর, কাশেম, মান্নান, সানাউল্লাহ এবং অন্যান্যরা। পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার সাজেদুর রহমান খান, মকবুলার রহমান এবং লুৎফর রহমান হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক বীমা কোম্পানিতে চাকরির সময় কোম্পানির ব্যবসা প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। কোম্পানিতে অনেকের চাকরি করার সুযোগ তৈরি করেছিলেন। এদে বীমা শিল্পে বাঙালি জনশক্তির বিকাশ ঘটে। এসব দেশপ্রেমিক কর্মীদের অনেকেই তাদের সুরক্ষিত স্থায়ী চাকরি ছেড়ে তার নতুন উদ্যোগে যোগ দিয়েছিলেন।
প্রবৃদ্ধি এবং পথিকৃতের ভূমিকা
স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশে বীমা শিল্প সামান্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। তারপরও হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিমাণ বছর শেষে ১৯৬০ সালে মাত্র ৬০ লক্ষ রুপি থেকে বেড়ে ১৯৬৯ সালে প্রায় ৩৮০ লক্ষ রুপি হয়েছিল। বার্ষিক প্রিমিয়াম আয় ১৯৬৯ সালে ১৭.৪ লক্ষ রুপিতে পৌঁছেছিল। ১৯৭০ সালের মধ্যে কোম্পানিটি পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে একটি শাখা সহ এগারোটি শাখা অফিস প্রতিষ্ঠা করেছিল; ঢাকায় ৪৮ দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় নিজস্ব প্রধান কার্যালয় ভবন নির্মাণ করে (তিন তলা সম্পন্ন, চৌদ্দ তলার জন্য কাঠামোগত ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল); একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনা বাহিনী এবং একটি মজবুত আর্থিক ভিত্তি তৈরি করে। ১৯৬৯ সালের শেষে জীবন বীমা ব্যবসায় লেনদেনকারী নয়টি বাংলাদেশী মালিকানাধীন কম্পোজিট কোম্পানির (একটি কোম্পানি একচেটিয়াভাবে সাধারণ বীমা লেনদেন করছিল) মধ্যে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ব্যবসার মানসম্পন্ন বৃদ্ধি এবং বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি ৪৯.৬ লক্ষ রুপির সর্বোচ্চ লাইফ ফান্ড ব্যালেন্স অর্জন করেছিল।
হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত প্রিমিয়াম পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তর হ্রাস পায়। পরবর্তীতে আরো নয়জন বাংলাদেশী উদ্যোক্তা মুজিবুর রহমানের পথ অনুসরণ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত এবং কিছু ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ বাঙালি মালিকানাধীন বীমা কোম্পানিগুলি:
কোম্পানির নাম প্রতিষ্ঠা সাল ব্যবস্থাপনা পরিচালক (কিছু ক্ষেত্রে)
হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৫৮ মুজিবুর রহমান
ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৫৯ মুস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী
ইস্ট পাকিস্তান কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স সোসাইটি ১৯৬১ এ কে ফজলুল হক (মওলা)
গ্রিনল্যান্ড মিউচুয়াল অ্যাসুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৬৩
গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৬৫ গোলাম মওলা
পাকিস্তান গ্যারান্টি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৬৫
ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৬৬
ইস্ট বেঙ্গল মিউচুয়াল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড ১৯৬৬
ফেডারেল লাইফ অ্যান্ড জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ১৯৬৯ খোদা বখশ
কোম্পানি লিমিটেড
জাতীয়করণ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ডেলিগেশন রিপোর্ট
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১ মার্চ, পাকিস্তান ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনকে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন (বিআইসি) এ উন্নীত করা হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র বাণিজ্য মন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী যিনি বাংলাদেশ জাতীয়করণ কর্মসূচিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন, তাকে এর প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন।
বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র বাণিজ্য মন্ত্রী ভারতের লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের কার্যক্রম এবং ভারতে সাধারণ বীমা ব্যবসার জাতীয়করণের স্কিম সম্পর্কে ধারণা নিতে চেয়েছিলেন। ভারতের বীমা শিল্পের ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয়করণের পদ্ধতি অধ্যয়নের জন্য এবং বাংলাদেশের বীমা শিল্পের জাতীয়করণের জন্য একটি রোড ম্যাপ প্রস্তাব করার জন্য ১৯৭২ সালের ১১-১৫ মার্চ বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স প্রতিনিধি দলকে ভারত সফরের দায়িত্ব দেন। মুজিবুর রহমান প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেব বাংলাদেশের বীমা শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। এছাড়াও মঞ্জুর মুর্শিদ, যুগ্ম সচিব, বাণিজ্য, কে টি আহমেদ, সেকশন অফিসার, বাণিজ্য এবং এস এ চৌধুরী, অ্যাকচুয়ারি (পরবর্তীতে ইন্স্যুরেন্স কন্ট্রোলার হন) সফর সঙ্গী ছিলেন।
সফরকালে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স প্রতিনিধি দল ভারতের লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের (এলআইসি) চেয়ারম্যান টি এ পাই, এলআইসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এম মেহতা, জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের (GIC সচিব আর সদগোপান, অ্যাকচ্যুয়ারি এবং এলআইসি’র প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভি এইচ ভেরা এবং আরও সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ ভারতের বেশ কয়েকজন বীমা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা বাংলাদেশের বীমা শিল্পের জাতীয়করণ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
১৯৭২ সালের ২২ মার্চ, মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ডেলিগেশন মিশনের রিপোর্ট জমা দেন। তিনি মিশনের ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ অনুযায়ী রিপোর্টটি সম্পন্ন করেন। রির্পোটে ভারতে বীমা পরিস্থিতি, ব্যবস্থাপনা, জাতীয়করণ পদ্ধতির বিশ্লেষণসহ বাংলাদেশের বীমা শিল্পের বীমা শর্তাবলী, ব্যবস্থাপনার অবস্থা এবং মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এর কথা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ বীমা শিল্পের জন্য জাতীয়করণের পদ্ধতির উপর সুপারিশগুলির সারসংক্ষেপ:
• জাতীয়করণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য, একটি কর্পোরেশন, যেমন, ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন’ জীবন এবং সাধারণ উভয় বীমা ব্যবসার জন্য দেশের বীমা ব্যবসা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত এবং উপযুক্ত হওয়া উচিত। এটি বীমা বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাব করা হয়েছিল। উপরন্তু, এর অধীনে একাধিক সহায়ক সংস্থাসহ একটি হোল্ডিং কর্পোরেশন অপ্রয়োজনীয়, জটিল, ব্যয়বহুল এবং এমনকি কার্যকরও হবে না এবং বীমা ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে সৃষ্ট ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
• পাকিস্তান-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিদেশি বীমাকারীদের পুরনো ব্যবসা জাতীয়করণ না করা যাদের বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিট দায় ছিল। বাংলাদেশের ভূখন্ডের মধ্যে বীমা ব্যবসার প্রায় ৮০% পাকিস্তান-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিদেশি কোম্পানি দ্বারা লেখা হতো যাদের শুধু প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে নামমাত্র সম্পদ ছিল। মার্চ ১৯৭২-এ, পাকিস্তান-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিদেশি বীমাকারীদের আর্থিক অবস্থার চূড়ান্ত মূল্যায়নের অপেক্ষায়, বাংলাদেশের ভূখন্ডের মধ্যে উপলব্ধ সম্পদ বাদ দেওয়ার পরে তাদের দায়ভার আনুমানিক মোট ৪০ কোটি টাকার নিট ঘাটতি অনুমান করা হয়েছিল (পাকিস্তান-ভিত্তিক কোম্পানিগুলির ২৬ কোটি টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিগুলির ১৪ কোটি টাকা, যথাক্রমে)। তদনুসারে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা ছিল পাকিস্তান-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিদেশি বীমাকারীদের পুরনো ব্যবসা বন্ধ ব্যবসা হিসাবে, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে, উপযুক্ত সময় না আসা পর্যন্ত পরিচালনা করা; এই সময়ে পাকিস্তানের সাথে এই বিষয়ে একটি মীমাংসা হতে পারে বলে আশা করা হয়েছিল।
•জাতীয়করণের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারির পরে নয়, এবং তার আগে সমস্ত যৌক্তিক ব্যবস্থা নেওয়া।
• বাংলাদেশে বীমা ব্যবসার ব্যবস্থাপনা অবিলম্বে সরকারের হাতে নেওয়া এবং সরকারের পক্ষে বীমাকারীদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য কেয়ারটেকার নিয়োগ করা, শুধুমাত্র বাংলাদেশের মালিকানাধীন স্থানীয় বীমাকারীদের জন্য।
• পাকিস্তান-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিগুলিকে দেশের বীমাকারী হিসাবে আইনগতভাবে গণ্য নাও করা যেতে পারে, সেই অনুযায়ী, এই বীমাকারীদের জন্য কেয়ারটেকার নিয়োগ করা উচিত নয়।
• জাতীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা, ক্ষতিপূরণের বিধান এবং ক্ষতিপূরণের প্রস্তাবিত পদ্ধতি নির্ধারণ করা। এর নিষ্পত্তি এবং ক্ষতিপূরণের আনুমানিক পরিমাণ নির্ধারণ করা।
• শুধুমাত্র বাংলাদেশের মালিকানাধীন স্থানীয় বীমাকারীদের জন্য ক্ষতিপূরণ গণনার উদ্দেশ্যে ভারত থেকে একজন অভিজ্ঞ অ্যাকচ্যুয়ারির পরিষেবা ভাড়া করা, যেহেতু অন্যান্য বীমাকারীদের সম্পদের চেয়ে দায় বেশি ছিল। পাশাপাশি পাকিস্তান-ভিত্তিক বীমাকারীদের সম্পদ ও দায়ের মূল্যায়নের জন্য।
এছাড়াও, রিপোর্টে নিম্নলিখিত মন্তব্যগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল:
• বাংলাদেশে বীমা শিল্পের অনুন্নত অবস্থা এবং বিশেষ করে, পাকিস্তান-ভিত্তিক এবং অন্যান্য বিদেশী বীমাকারীদের দ্বারা তহবিল স্থানান্তর ও তাদের বিনিয়োগে ঘাটতির কারণে, বাংলাদেশকে ৫০ কোটি টাকারও বেশি ভারী দায় নিয়ে শুরু করতে হবে। উপরন্তু, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতির কারণে, বেশ কয়েক বছর ব্যবসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত থাকবে।
• বীমা ক্ষেত্রে কঠিন কাজ হবে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করার পরিবর্তে মেরামত, একীকরণ এবং সুসংহত করা ।
• বাংলাদেশের মালিকানাধীন কম্পোজিট বীমা কোম্পানিগুলির অনিরাপদ আর্থিক স্বাস্থ্য। ১৯৬৯ সালের শেষে, দুটি কোম্পানি ব্যতীত (হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড এবং ইস্ট পাকিস্তান কোঅপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স সোসাইটি); বাকি সবগুলিই ছিল উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে, এবং যারা জীবন বীমা ব্যবসা লেনদেন করছিল তাদের ন্যূনতম বা ঋণাত্মক লাইফ ফান্ড ব্যালেন্স ছিল ।
মিশনের ২২ মার্চের রিপোর্টে সরকারকে জাতীয়করণের বিষয়ে অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছিল, কারণ এর বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা এবং বিলম্ব বীমা শিল্পের ক্ষতি করছিল। সরকারের indecision এবং বীমা ব্যবসার জাতীয়করণের জন্য একটি modus operandi নির্ধারণে বিলম্বের ফলে, কিছু অসাধু লোক এর সুযোগ নিয়ে অনিয়মের আশ্রয় নেয়। ১৯৭২ সালের পুরো বছরটি অসাধু উপাদানগুলির দ্বারা বীমা কোম্পানিগুলির সম্পদের নিয়ন্ত্রনহীন লুণ্ঠনের জন্য একটি অনুকূল সময় হিসাবে কাজ করেছিল । (Insurance Business in Bangladesh, pp.১৪-১৬, ১২১; শহীদ উদ্দিন আহমেদ, ব্যুরো অফ বিজনেস রিসার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৭)।
সরকারের সিদ্ধান্ত এবং পুনর্গঠন
১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট, সরকার বীমা শিল্পের জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স (জাতীয়করণ) আদেশ ১৯৭২ গ্রহণ করে। এই আদেশের ফলে পোস্টাল জীবন বীমা এবং বিদেশি জীবন বীমা কোম্পানি ব্যতীত, দেশের বীমা ব্যবসায় লেনদেনকারী মোট উনচল্লিশটি বীমা কোম্পানি ও সংস্থা দশটি বাংলাদেশী মালিকানাধীন কম্পোজিট কোম্পানি এবং ঊনচল্লিশটি পাকিস্তান-ভিত্তিক কোম্পানি- পাঁচটি কর্পোরেশন-এর অধীনে সরকারি খাতে স্থান পায়।
১৯৭২ সালের ৩০ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন বিলুপ্ত হয়। জাতীয়করণ আদেশের অধীনে, জাতীয় বীমা কর্পোরেশন চারটি সাবসিডিয়ারি কর্পোরেশনের কার্যক্রম তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শীর্ষ কর্পোরেশন হয়ে ওঠে:
• তিস্তা এবং কর্ণফুলী বীমা কর্পোরেশন সাধারণ বীমা আন্ডাররাইটিং-এর জন্য।
• রূপসা এবং সুরমা বীমা কর্পোরেশন জীবন বীমা আন্ডাররাইটিং-এর জন্য।
গ্রেট ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ও চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে জাতীয় বীমা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হন। তাকে জাতীয় বীমা কর্পোরেশনের তিনজন পরিচালক সমর্থন করেন: এ কে এম ফজলুল হক (মাওলা), খোদা বকশ এবং আলী আহমেদ। চারটি কর্পোরেশন পরিচালনার জন্য জাতীয় বীমা কর্পোরেশন কর্তৃক চারজন আলাদা ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করা হয়। চারজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন: মুস্তাফিজুর রহমান খান, গোলাম মাওলা, এম এ রহিম এবং এম এ সামাদ, যারা যথাক্রমে কর্ণফুলী, তিস্তা, রূপসা এবং সুরমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন।
উপরন্তু, প্রতিটি কর্পোরেশনের অধীনে চারটি বিভাগের (যেমন: (i) প্রশাসন, (ii) উন্নয়ন, (iii) আন্ডাররাইটিং এবং দাবি, এবং (iv) অর্থ ও হিসাব) দায়িত্ব পালনের জন্য চারটি করে পরিচালক (মোট ষোল জন পরিচালক) নিয়োগ করা হয়। এই চারটি কর্পোরেশনও ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু করে। এটি কল্পনা করা হয়েছিল যে কর্পোরেশনগুলির কার্যক্রম বাণিজ্যিক নীতির উপর পরিচালিত হবে এবং জনস্বার্থ বজায় রাখার জন্য একে অপরের মধ্যে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে ।
তবে একটি হোল্ডিং কর্পোরেশনের অধীনে চারটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি একটি গুরুতর ভুল প্রমাণিত হয়। পুনর্গঠনের ফলে বিভিন্ন সংস্থা থেকে আসা কর্মীদের মনে সন্দেহ, দ্বন্দ্ব, চাকরির নিয়মাবলী নিয়ে বিভ্রান্তি এবং শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা জন্ম নেয়। ফলস্বরূপ, পাঁচটি কর্পোরেশন (হোল্ডিং কর্পোরেশন সহ) পরিচালনার অযোগ্য হয়ে ওঠে। উপরন্তু, চারটি কর্পোরেশন এবং একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান, জাতীয় বীমা কর্পোরেশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশাসনিক ব্যয়ের বোঝা অসহনীয় ছিল।
Letter Of Representation (LOR) এবং চূড়ান্ত কাঠামো
১৯৭২ সালের অক্টোবরে, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের (বিআইসি) কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের (বঙ্গবন্ধু) কাছে বীমা শিল্পের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি লেটার অফ রিপ্রেজেন্টেশন (LOR) পাঠান। LORএ বলা হয়েছিল যে জাতীয়করণ প্রক্রিয়া অকার্যকর হয়ে পড়েছে কারণ জাতীয়করণ করা কোম্পানিগুলির প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তাদের নিজস্ব কোম্পানির কেয়ারটেকার হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পদের আরও ক্ষতি হয়। তদনুসারে জাতীয়করণ কর্মসূচি দায়ের জাতীয়করণে পরিণত হচ্ছিল!
LOR-এর পরপরই, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (বাণিজ্য বিভাগ) অধীনে একটি “বীমা সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি” Special Committee on Insurance প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বীমা সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি, ১৯৭৪ এর প্রতিবেদনটি ১৯৭২ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বেশিরভাগ কাস্টোডিয়ানদের দ্বারা সংঘটিত চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে (Insurance Business in Bangladesh, pp. ১৪-১৬, ১২১, Shahid Uddin Ahmed, Bureau of Business Research, University of Dacca, ১৯৭৭)
LOR-এ ২২ মার্চ, ১৯৭২-এর ইন্স্যুরেন্স ডেলিগেশন মিশনের রিপোর্ট এবং এর সুপারিশগুলির কথা উল্লেখ করা হয়, বিশেষ করে একটি কর্পোরেশনের জন্য- যে BICজাতীয়করণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত হওয়া উচিত। LOR আরও জানায় যে: “দুর্ভাগ্যবশত BIC-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের এই সঠিক পরামর্শ, যিনি ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন, তা কানে তোলা হয়নি। LOR-এর চূড়ান্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: “আমরা এই সব বলছি কারণ আমরা নিজেদেরকে নথিতে রাখতে চাই যে আমাদের বিষয়টি ডিফল্ট হয়নি, যে এই স্মারক ভুলগুলি করার সময় আমরা নীরব ছিলাম না। যে রোগগুলি বীমা শিল্পকে গ্রাস করেছে তার জন্য দ্রুত এবং তাৎক্ষণিক প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন”।
পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সরকার প্রতিযোগিতার মনোভাব বজায় রাখার ধারণা ত্যাগ করে শিল্পকে পতন থেকে বাঁচানো শ্রেয় মনে করে। ফলস্বরূপ, ১৯৭৩ সালের ১৪ মে, ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনস অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর অধীনে একটি পুনর্গঠন করা হয়। এই আইনের পর, পাঁচটি কর্পোরেশনের পরিবর্তে সরকার দুটি গঠন করে: সাধারণ ব্যবসার জন্য সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এবং জীবন ব্যবসার জন্য জীবন বীমা কর্পোরেশন। গোলাম মাওলা এবং খোদা বকশকে যথাক্রমে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন এবং জীবন বীমা কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ।
উপসংহার এবং উত্তরাধিকার
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ডেলিগেশন মিশনের রিপোর্টটি মুজিবুর রহমানের অসাধারণ জ্ঞান ও গভীরতা, মার্জিত বিশ্লেষণাত্মক স্পষ্টতা, পেশাদার সততা এবং নিবেদন প্রদর্শন করে। বিশেষ করে, এটি বাংলাদেশের বীমা শিল্পের স্থিতিশীল বিকাশের জন্য তার দূরদৃষ্টি প্রকাশ করে। দুর্ভাগ্যবশত, বীমা শিল্পে বিদ্যমান ক্ষমতার রাজনীতির কারণে ১৯৭২ সালের ৮ আগস্ট বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স (জাতীয়করণ) আদেশ ১৯৭২ মিশনের দুটি মৌলিক সুপারিশ বিবেচনা করেনি:
• বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন জাতীয়করণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত হওয়া উচিত।
• পাকিস্তান-ভিত্তিক বীমাকারীদের পুরনো ব্যবসায় জাতীয়করণ প্রয়োগ না করা যাদের বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিট দায় ছিল। প্রস্তাবিত ব্যবস্থা ছিল পাকিস্তান-ভিত্তিক বীমাকারীদের (ঊনচল্লিশটি) পুরনো ব্যবসা বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে বন্ধ ব্যবসা হিসাবে, উপযুক্ত সময় না আসা পর্যন্ত পরিচালনা করা। এই সময়ে পাকিস্তানের সাথে এই বিষয়ে একটি মীমাংসা হতে পারে বলে আশা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশর প্রথম মন্ত্রিসভার বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র বাণিজ্য মন্ত্রী এম আর সিদ্দিকী, সরকারের ১৯৭২ সালের ৮ আগস্টের জাতীয়করণ নীতির বিরোধিতা করা একমাত্র মন্ত্রিসভার সদস্য হিসাবে রেকর্ডভুক্ত হন। পরবর্তীতে, ১৯৭২ সালের ৯ আগস্ট মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন থেকে পদত্যাগ করেন।
বীমা খাত ছেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ডেলিগেশন মিশনের ১৯৭২ সালের ২২ মার্চের অমূল্য রিপোর্টটি হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের বীমা শিল্পের ঐতিহাসিকরা সেই মিশন এবং এর রিপোর্ট সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে, লেখক, মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশনের (বিআইসি) কর্মীদের দ্বারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের (বঙ্গবন্ধু) কাছে লেখা লেটার অফ রিপ্রেজেন্টেশন (LOR) সহ এই অমূল্য ঐতিহাসিক নথিটি আবিষ্কার করেন। মিশনের রিপোর্ট এবং LOR-এর মূল সুপারিশ এবং কিছু অপরিহার্য তথ্য এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা। সাহস, বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, সততা, সংকল্প এবং দেশপ্রেম পুরো কর্মজীবন জুড়ে তাকে পথ দেখিয়েছে। ঐতিহাসিকরা বাংলাদেশের প্রথম বাঙালি মালিকানাধীন বীমা শিল্প প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশী জনগণকে সহায়তা করার জন্য তার দৃষ্টিভঙ্গি ও আকাক্সক্ষা এবং বাংলাদেশের বীমা শিল্পের জাতীয়করণের প্রথম দিকে তার ভূমিকা অন্বেষণ করতে পারেন।
বাংলাদেশের বীমা শিল্পের ইতিহাসে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয় এবং তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে স্মরণ করা উচিত। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি জাতীয় পর্যায়ে একটি ছাপ রেখে গেছেন এবং তাকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তাঁর কীর্তি বাংলাদেশের বীমা শিল্পের ইতিহাস বইয়ে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখার যোগ্যতা রাখে। তিনি ১৯৭৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
Posted ৬:৪৩ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy